অর্থনৈতিক চাপ ও ঋণের বোঝার মধ্যেই নতুন ঋণনির্ভর প্রকল্পে ঢাকা ওয়াসা
ঢাকা ওয়াসা ইতোমধ্যে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণে জর্জরিত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ‘ঢাকা ওয়াসা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি স্থাপন’ নামে ৭২১ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৫৭১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য দেশীয় কর্মীদের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। তবে সরকারের রাজস্বঘাটতির প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন আগেই উঠেছিল। সমালোচনা উপেক্ষা করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
দেড় বছরে ১৩৫ নতুন প্রকল্প, ব্যয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে শেষ পর্যায়ে অনুমোদন পেয়েছে ৬৪টি প্রকল্প, যার ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি কম জরুরি ও বিতর্কিত প্রকল্পও রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাত। স্বাস্থ্য খাত শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও শেষ সময়ে বড় প্রকল্প অনুমোদনের কারণে এগিয়েছে। শিক্ষা খাতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আধিক্য দেখা গেছে। তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য আলাদা কোনো বড় উদ্যোগ বা স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়া হয়নি।
জেলা ভিত্তিক বরাদ্দে বৈষম্যের প্রশ্ন
নতুন প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রপ্তানি বাড়াতে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নকে এ বরাদ্দের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিপরীতে ২১টি জেলার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্প নেওয়া হয়নি, যা আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
নির্বাচনী তফসিলের পর প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে বিতর্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ কিছু রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে প্রভাব ফেলতে পারে। একনেকের সর্বশেষ বৈঠকগুলোতে বিপুল ব্যয়ের একাধিক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মধ্যে কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, সিলেট ও পটুয়াখালীর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনাও তৈরি হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ
স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা সংস্থার মতে, তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকারের ক্ষেত্রে সাধারণত রুটিন কাজের বাইরে বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়ার নীতি থাকে। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বড় প্রকল্প অনুমোদন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উপদেষ্টারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না এবং মাঠ পর্যায়ে কোনো উদ্বোধনও করছেন না, তাই স্বার্থের সংঘাতের সুযোগ নেই।
বড় ব্যয়ের প্রকল্প ও ঋণের বোঝা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাত সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহ বাড়াতে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকীকরণ, চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের মতো বড় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের আবাসনসহ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
ঋণ ও উন্নয়ন ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
গত এক দশকে উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সরকারি ঋণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বড় ও অগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে বড় প্রকল্প অনুমোদনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।
আঞ্চলিক বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য সামনে থাকলেও বাস্তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বিনিয়োগের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বৈষম্য সামাজিক বৈষম্যও বাড়াতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জটিল হলেও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত বলে মত দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন