তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সরকারি প্রকল্প ‘এসপায়ার টু ইনোভেট’ (এটুআই) ঘিরে বিতর্ক থামছেই না। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের জন্য লুটপাটের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পালিয়ে গেলেও এটুআইয়ের ভেতরের অনিয়ম থামেনি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এটুআইয়ের এক কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফাহিম। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা শাখার আমিরের ছেলে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াত-শিবির ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে একসময় চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে যে পরিচয়ের কারণে ফাহিম বিপাকে পড়েছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই পরিচয়ই যেন তার জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। চাকরিতে ফিরে এসে কার্যত এটুআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন তিনি। চাকরি হারানোর আগে তৃতীয় পক্ষের চুক্তিতে ‘প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে মাসে ৭০ হাজার টাকা বেতন পেতেন ফাহিম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর প্রভাব খাটিয়ে আবার চাকরিতে ফেরেন এবং এবার ‘কনসালট্যান্ট’ পদে নিয়োগ পান। নতুন পদে তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বেতন বেড়েছে প্রায় ৬১৮ শতাংশ।
অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগ, পদ পরিবর্তন বা বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি।
আরও অভিযোগ উঠেছে, চাকরিতে ফিরে ফাহিম এটুআইয়ের ভেতরে নিজের ঘনিষ্ঠ চারজনকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আরিফুর রহমান, সিনিয়র কনসালট্যান্ট নাহিদ আলম, কনসালট্যান্ট মাজেদুল আলম মাহি এবং জুনিয়র কনসালট্যান্ট শারমিন ফেরদৌসী। অভিযোগ অনুযায়ী, ফাহিম নিজের পাশাপাশি তাদেরও নিয়মের তোয়াক্কা না করে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি করিয়েছেন।
এর মধ্যে মাহির বেতন বেড়েছে ২৮৭ শতাংশ, আরিফুর রহমানের ১১৮ শতাংশ, নাহিদ আলমের ১৫৭ শতাংশ এবং শারমিন ফেরদৌসীর বেতন বেড়েছে ১০০ শতাংশ।
২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এটুআই প্রকল্পটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীনে আসে। সেই সময় প্রেষণে সেখানে কর্মরত ছিলেন উপসচিব নিলুফা ইয়াসমিন। তিনি ফাহিমের খালা। তার সুপারিশেই ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি তৃতীয় পক্ষের চুক্তিতে ‘প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট (ই-ফাইলিং)’ হিসেবে এটুআইয়ে যোগ দেন ফাহিম।
কিন্তু ২০২৩ সালের ১১ মার্চ রাজধানীর মিরপুরে একটি রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। অভিযোগ ছিল, স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে নাশকতার পরিকল্পনা করতে জামায়াত ও শিবিরের একটি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ওই ঘটনার পর এটুআইয়ের চুক্তিভিত্তিক চাকরি থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এটুআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিনই মিরপুর এলাকা থেকে শিবির পরিচয়ধারী প্রায় অর্ধশত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে এটুআই কার্যালয়ে আসেন ফাহিম। পরে ৮ আগস্ট বহিরাগতদের নিয়ে এটুআই কার্যালয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় প্রকল্প পরিচালক মামুনুর রশীদ ভূঁইয়াকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
ওই ঘটনার পর কয়েকজন শিবিরপন্থি ব্যক্তিকে এটুআইয়ে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা যায়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরে মাসিক সাড়ে তিন লাখ টাকা বেতনে কনসালট্যান্ট হিসেবে এটুআইয়ে ফেরেন ফাহিম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোনো প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগপ্রক্রিয়া ছাড়াই তার এই নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। কয়েকটি স্বল্পপরিচিত পত্রিকায় কনসালট্যান্ট নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল, যাতে বিষয়টি সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীদের নজরে না আসে।
তখন কনসালট্যান্টদের বেতনের সর্বোচ্চ সীমা ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম উপেক্ষা করে সরাসরি সেই সর্বোচ্চ সীমাতেই নিজের বেতন নির্ধারণ করান ফাহিম। অথচ সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী কোনো পণ্য বা সেবা সরাসরি সর্বোচ্চ সিলিং দামে কেনা হয় না।
এভাবে প্রায় ৪০০ শতাংশ বেশি বেতনে কনসালট্যান্ট হিসেবে যোগ দিয়ে ‘হেড অব প্রোডাক্টস’ হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।
ফাহিম যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর এটুআই প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করে কনসালট্যান্টদের সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণ করা হয় সাড়ে চার লাখ টাকা। এরপর নিয়োগের মাত্র তিন মাসের মাথায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি ফাহিমের বেতন বাড়িয়ে করা হয় ৪ লাখ টাকা।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন চুক্তি হয় তার সঙ্গে। এরপর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি আবারও এক বছরের জন্য সেই চুক্তি নবায়ন করা হয়। এবার সর্বোচ্চ বেতনসীমা নির্ধারণ করা হয় ৫ লাখ টাকা এবং সেই সর্বোচ্চ সীমাতেই বেতন নির্ধারণ করা হয় ফাহিমের।
অর্থাৎ ৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি থেকে এখন তার মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ টাকা।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী, কনসালট্যান্ট পদে নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অন্তত ১০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।
কিন্তু নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করার পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্মজীবন শুরু করেন ফাহিম। সে হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তার অভিজ্ঞতা ১০ বছর পূর্ণ হয়নি।
তবুও তাকে কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরে দুই দফা বেতন বাড়িয়ে সর্বোচ্চ সীমায় নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এটুআই প্রকল্পে কনসালট্যান্টদের কোনো যানবাহন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ না থাকলেও ফাহিম নিয়মিত প্রকল্পের একটি সাদা রঙের ২৫০০ সিসির এসইউভি ব্যবহার করছেন। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-০৬৫৯।
এ ছাড়া পূর্ণকালীন চুক্তিভিত্তিক কনসালট্যান্টদের অন্য কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ না থাকলেও তিনি ‘নকশি গ্লোবাল ড্রিম বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
ফাহিমের প্রভাবে তার ঘনিষ্ঠদেরও দ্রুত পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। তার বন্ধু মাজেদুল ইসলাম মাহি আগে ৭০ হাজার টাকা বেতনে জুনিয়র কনসালট্যান্ট ছিলেন। পরে তাকে কনসালট্যান্ট করা হয় এবং তার বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বর্তমানে তার বেতন ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
একইভাবে নাহিদ আলমের বেতনও ধাপে ধাপে বাড়িয়ে সাড়ে চার লাখ টাকা করা হয় এবং তাকে সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আরিফুর রহমানের বেতনও নতুন চুক্তিতে দুই লাখ ছয় হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে চার লাখ টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে জুনিয়র কনসালট্যান্ট শারমিন ফেরদৌসীর বেতন এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা হয়েছে।
এটুআইয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, পরামর্শক নিয়োগ ও বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গেটস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এটুআইয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থায়ন করে। তবে সাম্প্রতিক অনিয়মের অভিযোগের কারণে এসব সংস্থার কিছু প্রকল্পে নতুন করে অর্থায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল ফাহিম বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার দাবি, নিয়ম মেনেই তিনি কনসালট্যান্ট পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
চাকরি থেকে অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াত নেতার ছেলে হওয়ার কারণে তাকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রকল্প পরিচালককে অবরুদ্ধ করার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, যিনি তাকে নিয়োগ দিয়েছেন তার পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ নেই।
এ বিষয়ে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বর্তমান প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহা. আব্দুর রফিক বলেন, মব সৃষ্টি করে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে তার জানা নেই। তবে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন