ডিজিটাল ডেস্ক
১১ মার্চ ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
Shopno Bunon Real Estate (Reborn)

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সাধারণত ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচিত হলেও, এর পেছনে রয়েছে আরও দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এদিনই প্রথমবারের মতো বাঙালিরা সংগঠিতভাবে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানায়। ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রথম বড় মাইলফলক।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরপরই শাসকগোষ্ঠীর নীতিতে পূর্ব বাংলার মানুষ নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কারণ তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশই ছিল বাংলাভাষী।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে এই ভাষা প্রশ্নটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন কুমিল্লার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি প্রস্তাব দেন যে, পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত এবং গণপরিষদের কার্যক্রমেও বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুযোগ রাখা প্রয়োজন। কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রসমাজ ধর্মঘট পালন করে। এর পরপরই ভাষা আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করতে ২ মার্চ ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হয়। এই পরিষদ ছাত্রনেতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সুসংগঠিত করা।

সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১১ মার্চ সারা দেশে সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে। সেই ঘোষণার পর থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়। নির্ধারিত দিনে, অর্থাৎ ১১ মার্চ ভোর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। তারা মিছিল বের করে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর সামনে পিকেটিং শুরু করে।

ঢাকার সচিবালয়, রেলওয়ে স্টেশন, পোস্ট অফিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেয়। রাজপথ তখন মুখরিত হয়ে ওঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এবং ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে’—এই স্লোগানে। ছাত্রদের এই আন্দোলনে দ্রুত সাধারণ মানুষও যুক্ত হতে শুরু করে, ফলে আন্দোলনটি ক্রমেই ব্যাপক আকার ধারণ করে।

আন্দোলনের বিস্তার দেখে তৎকালীন সরকার কঠোর দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। পুলিশ আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করে এবং বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এতে বহু ছাত্র আহত হন। কিন্তু পুলিশি বাধা ও দমন-পীড়নের পরও আন্দোলন থেমে থাকেনি; বরং তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

সেদিন ব্যাপক ধরপাকড়ও চালায় পুলিশ। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব এবং শওকত আলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী এসব নেতার গ্রেপ্তারের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের স্রোত আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

১১ মার্চের ঘটনার পর আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং ১২ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত টানা বিক্ষোভ, মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চলতে থাকে। ছাত্রসমাজের সঙ্গে সাধারণ জনগণও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে শুরু করে। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন শেষ পর্যন্ত ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন।

আলোচনার ফল হিসেবে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একটি আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তীতে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়, তবু এটি ভাষা আন্দোলনের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের এই ঐতিহাসিক ধর্মঘট ও আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, মাতৃভাষার প্রশ্নে বাঙালি কোনো আপস করতে প্রস্তুত নয়। ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার এই সংগ্রাম পরবর্তীতে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ১১ মার্চের এই আন্দোলনই মূলত পরবর্তী সময়ের ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এই ধারাবাহিক সংগ্রামের ফলাফলই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা আন্দোলন, যেখানে ছাত্রদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

অতএব, ১১ মার্চ কেবল একটি ধর্মঘটের দিন নয়; এটি ছিল বাঙালির ভাষা ও আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রামের সূচনালগ্নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকেও প্রভাবিত করেছিল।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রবাসীদের সুখবর দিল আরব আমিরাত সরকার

সিম কিনে মামলার আসামি, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতারণার শিকার বহু পরিবার

ইরানের হামলায় ঘাঁটি ছেড়ে আত্মগোপনে হাজারো মার্কিন সেনা

যুদ্ধ বন্ধে তিন শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

আখাউড়া দেবগ্রামে রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক খুঁটি: দুর্ভোগ চরমে!

রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই : তাহের

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

মধ্যরাতে লাইভে এসে ২০ দিনের কাজের হিসাব দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

১০

৫ আগস্টের পর ভাগ্য খুলেছে জামায়াত নেতার ছেলের

১১

প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনা আমাদের দায়িত্ব

১২

তখন থেকে ঢালিউডে ‘নোংরামি’ শুরু! বিস্ফোরক দাবি অপু বিশ্বাসের

১৩

আকিজ বশির গ্রুপে চাকরি, দ্রুত অনলাইনে আবেদন করুন

১৪

জ্বালানি সংকট : আজ থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

১৫

এবার ২৬ মার্চে আলোকসজ্জা করা হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

তারেক রহমানকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিমানে ছিল গুরুতর ত্রুটি, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

১৭

হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে বাংলাদেশ : রাষ্ট্রপতি

১৮

পুলিশে ‘সার্জেন্ট’ পদে বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যেভাবে

১৯

ঈদে টানা ৭ দিনের ছুটি

২০