ডিজিটাল ডেস্ক
১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩:৪৯ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
Shopno Bunon Real Estate (Reborn)

জ্বালানি সঙ্কটে বিদ্যুৎ খাতের মহা চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি সঙ্কটে বিদ্যুৎ খাতের মহা চ্যালেঞ্জ

রমজানে বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখাই প্রধান লক্ষ্য : বিদ্যুৎমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিগত ভুলের প্রভাব এখনো বহন করছে দেশের সাধারণ মানুষ—এমন অভিযোগের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দলীয় সুবিধাভোগীদের লাভবান করতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু জ্বালানির ঘাটতির কারণে সেই সক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন না করেও বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা ভর্তুকির বোঝা বাড়াচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই শুরু হয়েছে রমজান ও আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুম—যে সময় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন নীতিগত ও আর্থিকভাবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমজানে সাহরি ও ইফতারের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সচিবালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তার ভাষায়, রোজা ও সেচ—এই দুটি বিষয় সামলানোই এখন অগ্রাধিকার; যত কম সম্ভব লোডশেডিং রাখতে চেষ্টা করা হবে।

সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বিদ্যুৎমন্ত্রী সবার সহযোগিতা কামনা করেন। উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, তিনি আগে এই মন্ত্রণালয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বকেয়া পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের শঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের চাপ সৃষ্টি নতুন সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করার শামিল হবে; সরকারকে সময় দিতে হবে।

গ্যাস উৎপাদন কমে বড় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা কয়েক বছর আগেও ছিল ২৭০-২৮০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় সরবরাহে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট; ফলে দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, কিন্তু ডলার সংকট ও রিজার্ভের চাপে আমদানিও সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে।

সক্ষমতা বাড়লেও উৎপাদন কমে গেছে। স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের কম। গ্যাসের অভাব, এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতা, কয়লার সংকট এবং ডলার ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন না করেও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে হচ্ছে। এতে বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড–এর আর্থিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬–১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায় এবং রমজানে সাহরি ও ইফতারের সময় হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি পায়। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় সম্পূর্ণভাবে লোডশেডিং এড়ানো কঠিন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নতুন মন্ত্রীর সামনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে রমজান ও গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখা জরুরি। মধ্যমেয়াদে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, সমুদ্র এলাকায় ব্লক উন্মুক্ত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো, বড় গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ সীমিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার দেওয়া, ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলেও জ্বালানি সংকট সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে তা সম্ভব নয়। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি নিশ্চিত না হওয়ায় তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না; ফলে বাড়ছে ভর্তুকি এবং অর্থনীতির ওপর চাপ। নতুন সরকারের জন্য এখন প্রধান লক্ষ্য—স্বল্পমেয়াদে রমজান ও গ্রীষ্ম সামাল দেওয়া, মধ্যমেয়াদে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা। এই তিন স্তরের সমন্বিত পরিকল্পনাই বিদ্যুৎ খাতের সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রবাসীদের সুখবর দিল আরব আমিরাত সরকার

সিম কিনে মামলার আসামি, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতারণার শিকার বহু পরিবার

ইরানের হামলায় ঘাঁটি ছেড়ে আত্মগোপনে হাজারো মার্কিন সেনা

যুদ্ধ বন্ধে তিন শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

আখাউড়া দেবগ্রামে রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক খুঁটি: দুর্ভোগ চরমে!

রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই : তাহের

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

মধ্যরাতে লাইভে এসে ২০ দিনের কাজের হিসাব দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

১০

৫ আগস্টের পর ভাগ্য খুলেছে জামায়াত নেতার ছেলের

১১

প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনা আমাদের দায়িত্ব

১২

তখন থেকে ঢালিউডে ‘নোংরামি’ শুরু! বিস্ফোরক দাবি অপু বিশ্বাসের

১৩

আকিজ বশির গ্রুপে চাকরি, দ্রুত অনলাইনে আবেদন করুন

১৪

জ্বালানি সংকট : আজ থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

১৫

এবার ২৬ মার্চে আলোকসজ্জা করা হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

তারেক রহমানকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিমানে ছিল গুরুতর ত্রুটি, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

১৭

হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে বাংলাদেশ : রাষ্ট্রপতি

১৮

পুলিশে ‘সার্জেন্ট’ পদে বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যেভাবে

১৯

ঈদে টানা ৭ দিনের ছুটি

২০