রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার একটি অত্যন্ত মূল্যবান প্লট নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছে। ঠিকানা: ২৫২ নম্বর (পুরাতন)/৭১ নম্বর (নতুন), সড়ক ১২/এ (নতুন নম্বর অনুসারে কিছু নথিতে ২২ নম্বর পুরাতন)। এক বিঘা আয়তনের এই প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য শত কোটি টাকারও বেশি। অথচ এই সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতি, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ এবং সরকারি নথির অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে।
স্বাধীনতার পর এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের তালিকায় থাকার কথা, কিন্তু গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় এবং অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নানা বাধা সৃষ্টি হয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র ধীরে ধীরে এটিকে ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই জমি পরিত্যক্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তির নামে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুরো ঘটনার শুরু স্বাধীনতার আগে। প্লটটির মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ কাজেম বেয়াদ। তিনি সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সে (সিআরপিএফ) কর্মরত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ইরানি নাগরিক শহরবানু জেওয়ার সুলতান। স্বাধীনতার পর কাজেম বেয়াদের মৃত্যু হয়। স্ত্রী শহরবানু লন্ডনে চলে যান এবং বাড়ির দেখভালের দায়িত্ব দেন ভাড়াটিয়া বেগম ওয়াহিদা খানমকে। দীর্ঘদিন মালিক দেশে না ফেরায় ওয়াহিদা খানম নিজেকে মালিক দাবি করেন। তাঁর দাবি, ১৯৭৩ সালে শহরবানুর সঙ্গে বিক্রয়চুক্তি ও বায়না সম্পন্ন হয়েছিল। পরে ১৯৭৪ সালে সাব-কবলা দলিল (নং ০৯৬১৫) সম্পাদন করে ওয়াহিদা খানমের নামে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ২০০১ সালে হামিদউদ্দিন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি লন্ডন দূতাবাসের মাধ্যমে শহরবানুর কাছ থেকে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার দাবি করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওই পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইন অনুসারে পরিত্যক্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের আমমোক্তার দলিল করার সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। ১৯৭৩ সালে ওয়াহিদা খানম শহরবানুর বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে ১৯৯৭ সালে মামলাটি ৩৩৪ নম্বরে রূপান্তরিত হয়। মামলা চলাকালীন ২০০৯ সালে ওয়াহিদা খানম ও হামিদউদ্দিন আহমেদের মধ্যে আপস-মীমাংসা হয়। ২০১১ সালে সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ১০ লাখ টাকা বায়না নেওয়া হয়। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিবরা স্পষ্ট করে বলছেন, স্বাধীনতার পর যেসব পাকিস্তানি বা বিদেশি নাগরিক দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের সম্পত্তি আইন অনুসারে রাষ্ট্রের অধীনে ন্যস্ত হয়। এ ধরনের সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবু গত ৫৫ বছরে এই প্লটের গেজেট প্রকাশ হয়নি। অধিগ্রহণের তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কার্যকর অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। এই ফাঁককে কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। আমমোক্তার দলিল, আপস-মীমাংসা এবং প্রভাবের ছায়ায় রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ দিকে এই জমি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে হামিদউদ্দিন আহমেদের নামে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে ২০০১ সালের ২৭ এপ্রিলের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের (নং ১৪৭/০১) ভিত্তিতে হামিদউদ্দিন আহমেদকে আমমোক্তার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অথচ ওই সময়ে জমিটি সরকারি তালিকায় ছিল। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কীভাবে এ ধরনের দলিল নিবন্ধন করল, মন্ত্রণালয় কীভাবে গ্রহণ করল—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
বর্তমানে প্লটটি চারদিকে বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। সামনে কয়েকটি দোকান রয়েছে। বাউন্ডারি দেয়ালে লেখা ‘নাফকো প্যালেস-৭১’। নাফকো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান এখানে ফ্ল্যাট বুকিংয়ের জন্য লোভনীয় অফার দিচ্ছে এবং ফোন নম্বরও প্রকাশ করেছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো অনুমোদিত চুক্তিপত্র জমা দেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্লটটি নিয়ে মামলা চলমান এবং বৈধ মালিক নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ। নাফকোর হেড অব মার্কেটিং রেজাউল করিম রাজ বলেন, তারা টাকা দিয়ে হামিদউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে পুরো জমি কিনে নিয়েছেন এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত। তিনি বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা বলতে চাননি।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুকূলে অধিগ্রহণকৃত প্লটগুলোর দখল হস্তান্তরের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু ওই তালিকায় এই প্লটটিকে বাদ দেখানো হয়। পরে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি নিঃশর্ত গেজেট জারি করে, যেখানে ধানমন্ডির এই প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জমিটি পরিত্যক্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং হামিদউদ্দিন আহমেদের নামে ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়া হয়েছে।
ওয়াহিদা খানমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। হামিদউদ্দিন আহমেদেরও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ওয়াহিদা খানমের কাছ থেকে ক্রয়সূত্রে ১০ কাঠার মালিকানা দাবি করা আবু তাহের আল মামুন বলেন, হামিদউদ্দিন আহমেদ এই জমির মালিকানা দাবি করছেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে এবং নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কেউ এই জমি বিক্রি করতে পারবে না।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তিনি জানতেন না। পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অবশ্যই বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে অবমুক্তকরণ বাতিল করে ফের পরিত্যক্ত তালিকায় নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় বিষয়টি এখনো বিস্তারিত জানা নেই। তবে খবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ঘটনা রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের এক উদ্বেগজনক নজির হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও এ ধরনের সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় দেয়নি, সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছায়ায় এমন হস্তান্তর হয় কীভাবে—এ প্রশ্ন এখন সবার মনে। পুরো বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কারণ এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষার কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না।
মন্তব্য করুন