বর্তমান সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “ঢাকা দক্ষিণ থেকে সিটি নির্বাচন করব ইনশাআল্লাহ।” তার এই ঘোষণার পরপরই রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইশরাক হোসেন। পরে তাকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন ঈদের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। এরই মধ্যে সোমবার ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের সবাই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা বলে জানা গেছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি সাম্প্রতিক সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করার আলোচনা হয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে। ইশরাক হোসেনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকা দক্ষিণে আবারও কি মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ইশরাক ও আসিফ?
ইশরাক হোসেন এর আগেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস, যিনি পরে মেয়র নির্বাচিত হন। তবে সেই নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তোলে ইশরাকের পক্ষ। ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়। তাপস দেশ ছেড়ে চলে গেলে মেয়র পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে আদালতের এক রায়ে ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয় এবং নির্বাচন কমিশন সে অনুযায়ী গেজেটও প্রকাশ করে। তবে আইনি জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি।
ওই সময় ইশরাক হোসেনের সঙ্গে তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য নির্বাচনে তাদের মুখোমুখি অবস্থান রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসন থেকে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জোর আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেননি আসিফ মাহমুদ। পরে তিনি এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সব মিলিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে এখন থেকেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। ইশরাক হোসেনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান, জোট সমীকরণ এবং নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণার দিকে সবার নজর রয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই সিটিতে নির্বাচন যে বহুল আলোচিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে—সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একমত।
মন্তব্য করুন