অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহসিন রশীদ। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নার ইউটিউব টকশো ‘মানচিত্র’-এ অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অ্যাডভোকেট মোহসিন রশীদ দাবি করেন, বর্তমান সরকার পরিচালনায় সংবিধানের মৌলিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে সাংবিধানিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের নজির তৈরি হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য উদ্বেগজনক।
তার অভিযোগের অন্যতম দিক ছিল রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ও মর্যাদা প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হওয়ার পর রাষ্ট্রপতিই ছিলেন দেশের একমাত্র সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে যথাযথভাবে অবহিত না করা এবং তার সাংবিধানিক অবস্থানকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এতে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এছাড়া রাষ্ট্রপতির ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও তোলেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তার দাবি, বিভিন্ন নথিপত্রে সই নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, যদি এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তা গুরুতর সাংবিধানিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মোহসিন রশীদ আরও উল্লেখ করেন, বঙ্গভবন ঘেরাও, প্রেস উইং অপসারণ এবং রাষ্ট্রপতিকে ‘চোর’ বলে সম্বোধন করার মতো ঘটনাগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি অবমাননার শামিল এবং এগুলো রাষ্ট্রদ্রোহমূলক আচরণ হিসেবে তদন্তের দাবি রাখে।
তিনি বলেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদের কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের আর্থিক, প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি বা বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি।
আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে মোহসিন রশীদ জানান, তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের বৈধতা ও সাংবিধানিক অবস্থান পর্যালোচনার জন্য রিভিউ আবেদন করার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “সরকার যদি নিজ উদ্যোগে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন না করে, তাহলে আমি লিগ্যাল নোটিশ পাঠাব এবং ড. ইউনূসকে পক্ষভুক্ত করে মামলা দায়ের করব।”
তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকার অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে লক্ষ্যেই তিনি এ উদ্যোগ নিতে চান। তিনি দাবি করেন, এটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ নয়; বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও আইনের শাসন রক্ষার স্বার্থেই তিনি এই অবস্থান নিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ঘোষণার ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও আইনি আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় কি না এবং সরকার এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান নেয় কি না।
মন্তব্য করুন