বাংলাদেশের অর্থনীতির এক টালমাটাল সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তিনি ঘোষণা দেন আর্থিক খাতে শুদ্ধি অভিযানের—ব্যাংকিং অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের। তাঁর বক্তব্যে ছিল দৃঢ়তা, নীতিগত কড়াকড়ি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় পর তাঁর বিদায়ের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—এই শুদ্ধি অভিযান কতটা ফলপ্রসূ হলো? আর এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ছিল?
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি এবং বিদেশে অর্থপাচার।
তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমানভাবে কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার বা দুর্নীতির অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকলেও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি বৃদ্ধি এবং নীতিগত কঠোরতার কারণে নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়ে—এমন অভিযোগ তুলেছেন একাধিক অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতা। পুঁজিবাজারেও দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার চিত্র দেখা যায়।
সমালোচকদের মতে, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নীতিগতভাবে সঠিক হলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বাজারে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—অভিযান ছিল উচ্চকণ্ঠ, কিন্তু ফলাফল কতটা সুস্পষ্ট?
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করা হয়, যার প্রভাবে ব্যাংকঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছে যায়। শিল্প ও ব্যবসা খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে কঠোর মুদ্রানীতির পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে কমেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—উচ্চ সুদের চাপ কি অর্থনীতিকে শীতল করেছে, নাকি প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর করেছে?
ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, খেলাপি ঋণের হার বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে—যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
এ সময় এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক” গঠন করা হয়। তবে এই নতুন কাঠামো এখনো প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা বা আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
গভর্নরকে ঘিরে আলোচিত একটি বিষয় ছিল দুবাইয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ। সামাজিক মাধ্যমে দাবি ওঠে, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর দুবাইয়ের আল জাদ্দাফ এলাকায় প্রায় ১৩.৫ মিলিয়ন দিরহাম মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে, যেখানে গভর্নর ও তাঁর মেয়ের নাম মালিকানা নথিতে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এই অভিযোগ সামনে আনেন সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। তবে অভিযোগের পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
ড. আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং অভিযোগটি ভিত্তিহীন। দুবাই ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের দলিলসংক্রান্ত তথ্য নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসে, যা বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১৪ মাসে তিনি ১৪ বার বিদেশ সফর করেন এবং মোট প্রায় ১০০ দিন বিদেশে অবস্থান করেন—এমন তথ্য সামনে এসেছে। পূর্ববর্তী গভর্নরদের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে বেশি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক কিছু অভিযোগও উত্থাপিত হয়। কর্মকর্তাদের একটি অংশ লিখিতভাবে অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করেন, যেখানে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
সরকারি ব্যয়সংকোচন নীতির মধ্যে গভর্নরের ব্যবহারের জন্য উচ্চমূল্যের একটি বিলাসবহুল এমপিভি কেনার অভিযোগও ওঠে। অভিযোগে বলা হয়, নির্ধারিত ক্রয়সীমা ও প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যাংক খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন, বোর্ড পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল নীতির পরিবর্তন এবং কঠোর মুদ্রানীতির মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। সমর্থকদের মতে, তিনি দীর্ঘদিনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধির চেষ্টা করেছেন। সমালোচকদের মতে, নীতিগত কঠোরতা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে।
সব মিলিয়ে তাঁর মেয়াদ শেষ হলো বিতর্ক, সংস্কার প্রচেষ্টা, কঠোর নীতি এবং প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের মিশেলে। দেশের অর্থনীতির জন্য এই অধ্যায়টি ভবিষ্যতে কীভাবে মূল্যায়িত হবে—তা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর বাস্তব প্রভাবের ওপর।
অর্থনীতির আকাশে যে বজ্রধ্বনি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি এখনো থামেনি। প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই শুদ্ধি অভিযান ছিল প্রয়োজনীয় ঝাঁকুনি, নাকি অনিশ্চয়তার আরেক অধ্যায়?
মন্তব্য করুন