খুলনায় মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে খুলনা মহানগরীতে এবং একটি জেলার দিঘলিয়া উপজেলায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং চরমপন্থী সম্পৃক্ততার জেরেই এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পর্দার আড়ালে সক্রিয় রয়েছে অন্তত সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা খুলনার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এই সময়ে অন্তত ৬০টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পুলিশের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সন্ত্রাসীরা অপরাধ করেও সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের বিচরণ এখন প্রায় নিয়মিত দৃশ্য। বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে অপরাধ চক্রের বিস্তার প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীর ৩০২টি বস্তিতে অন্তত দুজন করে প্রশিক্ষিত শুটার সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি বস্তিতে গড়ে চারজন করে নারী মাদক বিক্রেতার উপস্থিতির তথ্যও রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক ভাড়াটে হিসেবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করে থাকে। ফলে অপরাধ সংঘটনের পর মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত ম রোকনুজ্জামান বলেন, শুটাররা স্থায়ীভাবে এক জায়গায় অবস্থান করে না। তারা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থেকে চুক্তিভিত্তিক অপরাধে জড়ায়, যা শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর আফিল গেট এলাকায় পেট্রলপাম্পসংলগ্ন একটি গ্যারেজে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য অবস্থান করছিলেন ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখ। বিকেল ৩টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে এসে দুই যুবকের একজন তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
এ ঘটনায় মামলা হলেও এখনো হত্যার কোনো সুস্পষ্ট সূত্র বা জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। প্রকাশ্য দিবালোকে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আফিল গেটের ঘটনার একদিন পর দিঘলিয়া উপজেলার পথের বাজার এলাকায় ইজারার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা মুরাদ খান খুন হন। স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক লেনদেনের বিরোধকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
খুলনার অপরাধজগতের পুরোনো দ্বন্দ্বের একটি হলো গ্রেনেড বাবু ও পলাশ গ্রুপের আধিপত্য লড়াই। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই গোষ্ঠীর বিরোধে একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সর্বশেষ রোববার রাত ৯টার দিকে নগরীর নিরালা মোড়সংলগ্ন জাহিদুর রহমান ক্রস রোড এলাকায় এই বিরোধের জেরে আব্দুল আজিজ নামে এক যুবক খুন হন। তিনি পলাশ গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
মহানগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিশোর গ্যাং থেকে গড়ে ওঠা রোহান ও পলাশ গ্রুপ ভেঙে বর্তমানে তিনটি পৃথক বাহিনীতে রূপ নিয়েছে—পলাশ, গ্রেনেড বাবু ও নুর আজিমের নেতৃত্বে। পাশাপাশি দৌলতপুর অঞ্চলে চরমপন্থী হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ (আরমান/আরমিন নামে পরিচিত) এবং নাসিমুল গণি (নাসিম) আলাদা বাহিনী পরিচালনা করছেন।
নাসিম শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকায় তার বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে গত ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নাসিম ও আরমান কারামুক্ত হওয়ার পর পুনরায় সক্রিয়তা বাড়ে। ফলে বর্তমানে খুলনায় সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
শুধু নগরী নয়, জেলার ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তালা এলাকাতেও চরমপন্থী সংগঠনের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। উপকূলীয় কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের দাপট এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মাঝেমধ্যে অস্ত্রসহ কয়েকজন আটক হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।
পরপর তিনটি হত্যাকাণ্ড ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খুলনার নাগরিক সমাজ। তারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছে।
খুলনার নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে খুলনার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গড়ে প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ড ঘটছে। সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তিনি সরকারের কাছে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি জানান।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম বলেন, এখনই সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে খুলনা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। তিনি সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
খুলনার বর্তমান পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বস্তিভিত্তিক অস্ত্রধারী নেটওয়ার্ক, সক্রিয় সাত সন্ত্রাসী বাহিনী, মাদক ও চাঁদাবাজির বিস্তার—সব মিলিয়ে নগরবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সমন্বিত অভিযান, অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো তৎপরতা, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় সহিংসতার এই ধারাবাহিকতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মন্তব্য করুন