ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ ও ভুয়া নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং জমি দখলের মতো গুরুতর অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলায় শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ডিআইএ সারা দেশে মোট ৯৭৩টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বিশেষ তদন্ত পরিচালনা করে। এর মধ্যে ঝিনাইদহ জেলার ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা যায়, ভুয়া নিয়োগ, জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ, অন্যের জমি দখল করে প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং আর্থিক অনিয়মের মতো একাধিক অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। শুধু তাই নয়, পূর্বে ঝিনাইদহের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাল সনদধারী শিক্ষকদের কাছ থেকে ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা পরস্পরের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম করে আসছিলেন। সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নিয়োগ অনুমোদন এবং ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির মতো গুরুতর আর্থিক অপরাধেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের কারণে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থদণ্ড ও জরিমানা আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া তদন্তে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৭৬ একরেরও বেশি জমি অনিয়মের মাধ্যমে দখল করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ বা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ডিআইএ এসব জমি পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে। প্রতিবেদনের অনুলিপি ইতোমধ্যে ডি-নথি ও ই-মেইলের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতরে পাঠানো হয়েছে।
ঝিনাইদহ জেলার যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ডিগ্রি কলেজ, কে.ডি.এইচ.বি.ইউ দাখিল মাদ্রাসা, ইশ্বরবা দাখিল মাদ্রাসা, আলহাজ্ব আমজাদ আলী ও ফাইজুর রহমান মহিলা কলেজ, দামোদর কারামতিয়া দাখিল মাদ্রাসা, সুন্দরপুর দাখিল মাদ্রাসা; কোটচাঁদপুরের বিসিবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়; মহেশপুরের কালুহাটী, গৌরিনাথপুর ও ঘোড়াশাল হামিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা; বিদ্যাধরপুর, বৈচিতলা ও সামন্তা মাধ্যমিক বিদ্যালয়; শৈলকুপার কামান্না বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও পাঁচপাখিয়া সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসা; ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আমেনা খাতুন কলেজ, জিয়ালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দোহাকুলা দাখিল মাদ্রাসা, নুরনগর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদ্রাসা, হরিশংকরপুর জগৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং হলিধানী আলিম মাদ্রাসা।
এদিকে, জেলায় জাল সনদে নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে চিহ্নিত ১০ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) তাদের চাকরিচ্যুতি, বেতন-ভাতা ফেরত আদায়, অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট সুবিধা বাতিল এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশনা দিয়েছিল। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
মাউশির তালিকাভুক্ত জাল সনদধারী শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন—হরিনাকু পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) মঈন উদ্দিন, ঝিনাইদহ শিশুকুঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম) তপন কুমার বিশ্বাস, ডেফলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (শরীরচর্চা) জাহিদুল ইসলাম, বংকিরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কৃষি) মামুন অর রশিদ, নলডাঙ্গা ভুষণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (সমাজবিজ্ঞান) হাজেরা খাতুন, বহরমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ইসলাম ধর্ম) ড. মাহফুজা খানম ও একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার শিক্ষক শামীমা আক্তার, বাসুদেবপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রহমান, লালন একাডেমি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) রাজিয়া খাতুন এবং গুড়দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) মোস্তাফিজুর রহমান।
ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা অফিসার লুৎফর রহমান এ বিষয়ে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার দফতরে পৌঁছেনি, তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন তিনি দেখেছেন। তিনি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা শিক্ষা অফিস ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, জাল সনদে চাকরির অভিযোগে অভিযুক্ত ১০ জন শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করায় অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ায় ঝুলে আছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং দখলকৃত জমি উদ্ধারসহ আর্থিক ক্ষতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মন্তব্য করুন