ইসমাইল হোসেন
১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩:০৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
Shopno Bunon Real Estate (Reborn)

অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা

অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা

বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে উত্থান ও বিকাশ এক বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭০ সালে এ অঞ্চলের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট গণরায় দেয়। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেই রায় অস্বীকার করলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক ইচ্ছাকে দমন করার ফলেই পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বহু পুরোনো এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। ভারতের এই অঞ্চলের ‘বেঙ্গল’ অংশ রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর হওয়ায় তার প্রভাব পূর্ববঙ্গেও পড়েছিল।

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বিজয় সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ দেয়। ১৯৪৬ সালে একই জনগণ নিরঙ্কুশভাবে মুসলিম লীগকে ক্ষমতায় আনে। কিন্তু ইতিহাসের এক বিস্ময়কর মোড় আসে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, যখন ভোটের মাধ্যমে মুসলিম লীগকে কার্যত বিদায় জানানো হয়। যদি পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকত, তবে রাষ্ট্রটির আয়ু হয়তো দীর্ঘ হতে পারত। কিন্তু নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পাকিস্তানের পতন ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক ইতিহাস তাদের গণতান্ত্রিক চেতনারই প্রতিফলন—যখনই অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে, তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ নিপীড়নের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত প্রতিরোধ।

রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যা সময়ের হিসেবে সংক্ষিপ্ত হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে দীর্ঘস্থায়ী। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তেমনই এক অধ্যায়। এই সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি এবং পূর্ণ সাংবিধানিক ম্যান্ডেটও ছিল না। তবু ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামো, মানবাধিকার সংকট ও রাজনৈতিক অনাস্থার মধ্যে তাদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তাই এই সময়ের মূল্যায়নে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাই অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচনী ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া, প্রশাসনের দলীয়করণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর কঠোর দমন-পীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কারাবন্দি নির্যাতন ও হাজারো মামলার ঘটনা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে দেখা হয়। এই বাস্তবতায় জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র একটি রূপান্তরপর্বে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কোনো একদিনের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ভাঙন ঠেকানো এবং ন্যূনতম শাসন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।

ক্ষমতা পরিবর্তনের পরই নানা দাবি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর আন্দোলন শুরু হয়। যৌক্তিক সংস্কারের দাবি যেমন ছিল, তেমনি সুযোগসন্ধানী আন্দোলনও দেখা যায়। ফলে সরকারকে এক ধরনের ‘ওভারলোডেড ট্রানজিশনাল স্টেট’-এর বাস্তবতায় কাজ করতে হয়েছে, যেখানে প্রত্যাশা রাষ্ট্রের সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।

পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে পতিত সরকারের বিদেশে অবস্থান থেকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে প্রতীকী স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যা একদিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য ছিল রাষ্ট্রের পূর্ণ পতন ঠেকানো। রাষ্ট্রের বৈধ বলপ্রয়োগের ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকার সেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে না পারলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।

রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন ছিল গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে এই কমিশনের লক্ষ্য ছিল বিভক্ত সমাজে ন্যূনতম সমঝোতা গড়ে তোলা। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন পক্ষকে আলোচনায় আনার প্রচেষ্টা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

এছাড়া বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একাধিক কমিশন গঠন করা হয়। যদিও সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তবুও ভবিষ্যৎ সংস্কারের একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

জুলাই সনদ এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে অবস্থান করে। এটি শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল নয়; বরং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধের প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচিত। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের উদ্যোগকে তাই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলা হয়।

তবে সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি এবং দুর্নীতির কাঠামোগত পরিবর্তনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। সরকারের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের সময়ের তুলনায় উন্নত হয়, যদিও মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুলের উত্তরাধিকার এসব চ্যালেঞ্জকে কঠিন করে তোলে। তবুও রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে জন প্রত্যাশা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ইতিবাচক সূচকগুলো অনেক সময় সামাজিক সন্তুষ্টিতে প্রতিফলিত হয়নি।

সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে এককভাবে সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। এটি ছিল সংকটকালীন সেতুবন্ধ সরকার, যার প্রধান অবদান রাষ্ট্রীয় পতন রোধ, রাজনৈতিক পরিসর আংশিক উন্মুক্ত করা এবং সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ঐকমত্যের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। ১৯৯০ পরবর্তী রাজনৈতিক ঐকমত্য থেকেও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি। উত্তরাধিকারভিত্তিক রাজনীতি সংস্কারের পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। গণবিপ্লবের পর প্রাথমিক ঐক্য আশার আলো দেখালেও সময়ের সঙ্গে বিভাজন বাড়ায় সংস্কারের সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় সনদের পক্ষে গণভোট ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের ওপর। এখন দেখার বিষয়—পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই সম্ভাবনাকে কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

I
Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রবাসীদের সুখবর দিল আরব আমিরাত সরকার

সিম কিনে মামলার আসামি, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতারণার শিকার বহু পরিবার

ইরানের হামলায় ঘাঁটি ছেড়ে আত্মগোপনে হাজারো মার্কিন সেনা

যুদ্ধ বন্ধে তিন শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

আখাউড়া দেবগ্রামে রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক খুঁটি: দুর্ভোগ চরমে!

রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই : তাহের

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

মধ্যরাতে লাইভে এসে ২০ দিনের কাজের হিসাব দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

১০

৫ আগস্টের পর ভাগ্য খুলেছে জামায়াত নেতার ছেলের

১১

প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনা আমাদের দায়িত্ব

১২

তখন থেকে ঢালিউডে ‘নোংরামি’ শুরু! বিস্ফোরক দাবি অপু বিশ্বাসের

১৩

আকিজ বশির গ্রুপে চাকরি, দ্রুত অনলাইনে আবেদন করুন

১৪

জ্বালানি সংকট : আজ থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

১৫

এবার ২৬ মার্চে আলোকসজ্জা করা হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

তারেক রহমানকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিমানে ছিল গুরুতর ত্রুটি, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

১৭

হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে বাংলাদেশ : রাষ্ট্রপতি

১৮

পুলিশে ‘সার্জেন্ট’ পদে বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যেভাবে

১৯

ঈদে টানা ৭ দিনের ছুটি

২০