ডিজিটাল ডেস্ক
২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:৫০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
Shopno Bunon Real Estate (Reborn)

কওমি ঘরানায় প্রকট রাজনৈতিক বিভাজন

কওমি ঘরানায় প্রকট রাজনৈতিক বিভাজন

‘কওমি’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই বাংলাদেশের ধর্মীয়-সামাজিক বাস্তবতার এক জটিল ও বহুমাত্রিক চিত্র সামনে ভেসে ওঠে। বিস্তৃত মাদরাসা নেটওয়ার্ক, লাখো শিক্ষার্থী, প্রভাবশালী আলেমসমাজ এবং গ্রাম-শহরজুড়ে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে কওমি অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী সামাজিক বলয় হিসেবে পরিচিত। তবে একই পরিসরের ভেতরে রয়েছে মতপার্থক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, কৌশলগত ভিন্নতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে টানাপোড়েন। সারা দেশে কওমি নেতৃত্বের বিস্তার থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ঐক্য গড়ে ওঠেনি; বরং বিভাজনই সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সেই বিভক্ত চিত্র নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ঐতিহাসিকভাবে কওমি ধারার মূল ভিত্তি ধর্মীয় শিক্ষা। ভারতের দেওবন্দি শিক্ষাপদ্ধতি থেকে উদ্ভূত এই ধারাটি উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠার পর উপমহাদেশ পেরিয়ে বাংলাদেশে বিস্তৃত হয়। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত কওমি মাদরাসাগুলো ধর্মীয় শিক্ষার একটি স্বতন্ত্র ধারাকে ধারণ করে রেখেছে। দেশের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদরাসা দীর্ঘদিন কওমি নেতৃত্ব ও প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণকারী আলেমরা সারা দেশে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় দাওয়াতি কার্যক্রম এবং সামাজিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

তবে কওমি অঙ্গনের ভেতরের ঐক্য সব সময় দৃঢ় ছিল না। গত এক দশকে কয়েকটি বড় ঘটনা অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে সামনে নিয়ে আসে। ২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিস সনদের সরকারি স্বীকৃতি, ২০২০ সালে শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তন, ২০২১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় কওমি অঙ্গনের ভেতরের কৌশলগত ও সাংগঠনিক পার্থক্য আরও প্রকট হয়।

২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার পর থেকেই কওমি ঐক্যে চিড় ধরার আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ইন্তেকাল কওমি অঙ্গনে বড় শূন্যতা তৈরি করে। হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্রদের আন্দোলন, নেতৃত্ববিরোধী অবস্থান এবং পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠনের ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হলেও ভেতরের দ্বন্দ্ব পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।

২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন এবং পরবর্তী সহিংসতার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ব্যাপক গ্রেপ্তার, মামলা ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে হেফাজত চাপে পড়ে এবং কার্যত দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়—একটি সমঝোতামুখী, অন্যটি আন্দোলনমুখী। এই সময় থেকেই কওমি রাজনীতির ভেতরে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা দেয়। কেউ সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষে, কেউ বাস্তববাদী সমঝোতার কৌশলকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।

প্রখ্যাত আলেম ও লেখক মুফতি হারুন ইজহার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কওমিরা ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার পেছনে সাংগঠনিক দুর্বলতা বড় কারণ। তার মতে, একসময় হেফাজতে ইসলাম বৃহৎ ঐক্যের ভিত গড়ে তুললেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

বর্তমানে কওমি অঙ্গনে সক্রিয় দলগুলোর মধ্যে রয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট। এসব দলের আদর্শিক অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে অভিন্ন হলেও নির্বাচনি কৌশল, জোট রাজনীতি, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং কৌশলগত অবস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

হেফাজতে ইসলাম মূলত কওমি শিক্ষাব্যবস্থা ও ইসলামী নৈতিকতা সংরক্ষণের দাবিতে সক্রিয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না। তবে তাদের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ও অবস্থান অনেক সময় ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং জোটভিত্তিক অবস্থান নিয়ে প্রায়ই আলোচনায় আসে। খেলাফত মজলিস ও তার বিভিন্ন শাখার মধ্যে নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রশ্নে বিভক্তি রয়েছে। নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি ঐতিহ্যগত ইসলামিক রাষ্ট্রকাঠামোর পক্ষে থাকলেও বাস্তব রাজনীতিতে কখনো জোটে, কখনো স্বতন্ত্রভাবে অবস্থান নেয়। ইসলামী ঐক্যজোট ছোট দলগুলোকে সমন্বয়ের চেষ্টা করলেও অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য তাদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে দেয়নি।

মাওলানা ইসহাক খান মত দেন যে, মতভিন্নতা সব ধারাতেই থাকে, তবে কওমি অঙ্গনে রাজনীতিকেন্দ্রিক বিভাজন দুঃখজনক। তার মতে, ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার প্রতিযোগিতা কখনো কখনো আদর্শিক প্রশ্নকে দুর্বল করে দেয়। একইভাবে মুফতি শফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ইসলামী দলগুলোর শক্তিশালী হওয়ার কথা থাকলেও পরিবারতন্ত্র, নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক বলয়, শিক্ষক-পীরভিত্তিক অনুসরণ, নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব এবং ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

গত চার দশকে বিভাজনের ধারা ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে। ১৯৮০–৯০-এর দশকে খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলনের উত্থান দেখা গেলেও ১৯৯০–২০০০ সালের মধ্যে নতুন দল ও শাখা গঠনের ফলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ে। ২০০০–২০১০ সালে হেফাজতের উত্থান কওমি শক্তিকে নতুনভাবে দৃশ্যমান করলেও কৌশলগত ঐক্য স্থায়ী হয়নি। ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, রাজনৈতিক সমঝোতা ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বিভাজনের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিসকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ নামে কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠন করা হয়। কিন্তু বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতপার্থক্য তৈরি হয়। কেউ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে, কেউ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়। এতে শিক্ষাব্যবস্থার প্রশাসনিক প্রশ্নও রাজনৈতিক রূপ পায়।

এ ছাড়া ২০১৮ সালে এক শোকরানা মাহফিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। কেউ এটিকে কৌশলগত স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন, কেউ আদর্শিক আপস হিসেবে সমালোচনা করেন। নারী শিক্ষা ও বোর্ড নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও প্রথাগত ও আধুনিকপন্থী মতের সংঘাত সামনে আসে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কওমি ঘরানার দলগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়। নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জাতীয় ভোটের ২ দশমিক ৭০ শতাংশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং খেলাফত মজলিস ০ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পায়। ২৯৭টি আসনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন একটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসন লাভ করে। ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়, অংশগ্রহণ থাকলেও তারা একক ও শক্তিশালী নির্বাচনি ব্লক গঠন করতে পারেনি। ইসলামপন্থি ভোট বিভক্ত থাকায় বড় রাজনৈতিক দলগুলো তুলনামূলক সুবিধা পায়।

বিশ্লেষকদের মতে, কওমি অঙ্গন আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার দাবি করলেও বাস্তবে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কোনো কোনো সময় শীর্ষ নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্যও সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

সব মিলিয়ে কওমি রাজনীতি আজ বহুমাত্রিক ও বিকেন্দ্রীভূত। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব বজায় থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আদর্শিক সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, কৌশলগত মতভেদ ও প্রজন্মগত ফারাক তাদের বিভক্ত রেখেছে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনি রাজনীতিতেও এই বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রবাসীদের সুখবর দিল আরব আমিরাত সরকার

সিম কিনে মামলার আসামি, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতারণার শিকার বহু পরিবার

ইরানের হামলায় ঘাঁটি ছেড়ে আত্মগোপনে হাজারো মার্কিন সেনা

যুদ্ধ বন্ধে তিন শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

আখাউড়া দেবগ্রামে রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক খুঁটি: দুর্ভোগ চরমে!

রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই : তাহের

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

মধ্যরাতে লাইভে এসে ২০ দিনের কাজের হিসাব দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

১০

৫ আগস্টের পর ভাগ্য খুলেছে জামায়াত নেতার ছেলের

১১

প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনা আমাদের দায়িত্ব

১২

তখন থেকে ঢালিউডে ‘নোংরামি’ শুরু! বিস্ফোরক দাবি অপু বিশ্বাসের

১৩

আকিজ বশির গ্রুপে চাকরি, দ্রুত অনলাইনে আবেদন করুন

১৪

জ্বালানি সংকট : আজ থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

১৫

এবার ২৬ মার্চে আলোকসজ্জা করা হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

তারেক রহমানকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিমানে ছিল গুরুতর ত্রুটি, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

১৭

হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে বাংলাদেশ : রাষ্ট্রপতি

১৮

পুলিশে ‘সার্জেন্ট’ পদে বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যেভাবে

১৯

ঈদে টানা ৭ দিনের ছুটি

২০