মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আপাতত বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি কোনো বড় ধাক্কা না দিলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলে জোরালো হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানিনির্ভর এবং অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। এ বাস্তবতায় সরকার বিকল্প উৎস খুঁজতে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দেশের জ্বালানির মজুত, আমদানি পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন এবং অন্তত আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার ওপর জোর দেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোসহ বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় অংশই আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এসব দেশ থেকে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় তেল আমদানি করে। পাশাপাশি কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হয়। অন্যদিকে এলপিজির প্রায় পুরো সরবরাহই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা। আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা না এলেও বাস্তবে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বাজারে খবর ছড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ, যা উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এ পথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানির বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের ওপর পড়বে। তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ চেইন ভেঙে গেলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে। তাই বিকল্প উৎস খোঁজা এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানো এখন জরুরি।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। বিপিসি সূত্র জানায়, গতকাল পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১২ দিনের। অকটেনের মজুত ২৯ দিন, পেট্রোল ১৯ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯০ দিন, জেট ফুয়েল ১৫ দিন, কেরোসিন ২৮৫ দিন এবং মেরিন ফুয়েল ৪২ দিনের মজুত রয়েছে।
সরবরাহ অব্যাহত রাখতে নতুন চালানও আসছে। সম্প্রতি ৩৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি টরম অ্যাগনেস’ নামের একটি জাহাজ বহির্নোঙরে ভিড়েছে। এছাড়া ৩০ থেকে ৩২ হাজার টন ডিজেলবোঝাই আরও দুটি জাহাজ সমুদ্রে রয়েছে, যেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছানোর কথা। তবে মার্চ মাসে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে আসার কথা থাকা দুটি জাহাজের চালান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব কনসাইনমেন্ট নির্বিঘ্নে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির কার্যাদেশ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২৪ লাখ ২০ হাজার টন উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হবে এবং বাকি ১৪ লাখ টন মধ্যপ্রাচ্য থেকে জি-টু-জি চুক্তির আওতায় আসবে। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, অন্তত জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা নেই। মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা নেই। তবে অপরিশোধিত তেলের দীর্ঘমেয়াদি উৎস মধ্যপ্রাচ্য হওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ এলএনজি নিয়ে। দেশে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৬৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আসে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে। বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে। গত বছর এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। মার্চ মাসে অন্তত ৯টি কার্গো মহেশখালীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে এবং নিয়মিত দু-তিন দিন পরপর একটি করে কার্গো খালাস হচ্ছে। তবে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা জানতে কাতার ও ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
এলপিজি বাজারেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে এবং এর প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি বছরের শুরু থেকেই বাজারে সরবরাহে কিছুটা চাপ রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এলপিজির সরবরাহ ও মূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই অস্থিরতা বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারকে এখনই বিকল্প উৎস যেমন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য এশীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে কৌশলগত মজুত বাড়ানো, স্পট মার্কেট থেকে ক্রয় বাড়ানো এবং সরবরাহ চেইন বহুমুখীকরণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান মজুত ও চলমান আমদানির কারণে তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা না থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতিই হতে পারে সম্ভাব্য সংকট এড়ানোর একমাত্র উপায়।
মন্তব্য করুন