যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন শুধু একজন অপরাধী নন, ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের অন্ধকার জগতের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি প্রকাশ করলে বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। এই নথি প্রকাশের পর বহু মানুষের ব্যক্তিগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের নাম প্রকাশ্যে আসায় সামাজিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন, ভেঙে গেছে সংসার, কেউ হারিয়েছেন পদ বা ক্ষমতা, আবার কেউ তদন্তের মুখে পড়েছেন।
তবে ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠায় ডিওজে তাদের ওয়েবসাইট থেকে এপস্টেইন–সংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক নথি সরিয়ে নেয়। অভিযোগ করা হয়, নথি প্রকাশের সময় তথ্য গোপন করার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ত্রুটি ছিল, যার ফলে অনেক ভুক্তভোগীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আইনজীবীদের দাবি, গত শুক্রবার প্রকাশিত নথির ভুল সম্পাদনার কারণে শতাধিক মানুষের জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে। প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে এমন ই-মেইল ঠিকানা ও আপত্তিকর ছবি ছিল, যেগুলো থেকে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের পরিচয় জানা সম্ভব হচ্ছিল।
এক যৌথ বিবৃতিতে ভুক্তভোগীরা ঘটনাটিকে ‘চরম আপত্তিকর’ বলে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়াই নাম প্রকাশ করা তাদের নতুন করে মানসিক যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ডিওজে জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়া নথিগুলো ইতোমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এ ভুল ‘প্রযুক্তিগত বা মানবিক ত্রুটির’ কারণে হয়েছে। ফেডারেল বিচারকের কাছে জমা দেওয়া এক চিঠিতে বিভাগটি জানায়, ভুক্তভোগী ও তাদের আইনজীবীদের অনুরোধে চিহ্নিত নথি সংশোধনের জন্য সরানো হয়েছে এবং নতুন করে আরও কোনো নথি সরানোর প্রয়োজন আছে কি না তা পর্যালোচনা চলছে।
মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের পরই এই নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক ছিল। তবে শর্ত ছিল, ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা যায় এমন সব তথ্য অবশ্যই মুছে ফেলতে হবে। এই শর্ত ভঙ্গের অভিযোগেই ভুক্তভোগীদের পক্ষে দুই আইনজীবী নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে ওয়েবসাইট বন্ধের আবেদন করেন। তারা বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তার অন্যতম ভয়াবহ লঙ্ঘন।
আইনজীবী ব্রিটানি হেন্ডারসন ও ব্র্যাড এডওয়ার্ডস জানান, হাজার হাজার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য মুছতে ব্যর্থ হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিছু ভুক্তভোগী চিঠিতে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একজন বলেন, এই প্রকাশ তার জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকজন জানান, ব্যাংক হিসাবের তথ্য ফাঁস হওয়ায় তিনি প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছেন।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগী অ্যানি ফারমার বলেন, এই ভুলের কারণে নতুন তথ্যের গুরুত্বও আড়াল হয়ে যাচ্ছে। আরেক ভুক্তভোগী লিসা ফিলিপস জানান, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও অনেক নথি প্রকাশ হয়নি এবং বহু ভুক্তভোগীর নাম ফাঁস হয়েছে—যা তাদের সঙ্গে ‘খেলা করার’ মতো।
নারীবাদী আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড বলেন, অনেক নথিতে নামের ওপর কেবল দাগ টানা হয়েছে, যা সহজেই পড়া যায়। এমনকি কিছু ভুক্তভোগীর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যারা কখনো প্রকাশ্যে আসেননি।
ডিওজে বলছে, লাখো পাতার নথিতে হাজার হাজার নাম মুছে ফেলা হয়েছে এবং তারা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। গত বছর আইন করে নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক হওয়ার পর থেকে প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বিচার শুরুর আগেই এপস্টেইনের মৃত্যু হয়।
নতুন নথিতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম আসায় বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিযোগ ওঠার পর তিনি উইন্ডসর-এর রয়্যাল লজ ছেড়ে নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে চলে যান। এদিকে সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর সরকারি তথ্য পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। চাপের মুখে তিনি সংসদীয় পদ ছাড়েন।
নথিতে নাম আসায় বিল গেটসের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস জানান, এ ঘটনা তাদের বিবাহিত জীবনের কঠিন সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই কেলেঙ্কারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইলন মাস্ক এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নামও আলোচনায় এসেছে। ক্লিনটন এতদিন সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালেও এখন কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হয়েছেন; তার স্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও সাক্ষ্য দেবেন।
মন্তব্য করুন