শ্রীলঙ্কার প্রাচীন রাজধানী অনুরাধাপুরার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা জেতবনরামায়া শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং প্রাচীন প্রকৌশলের এক বিস্ময়কর নিদর্শন। প্রায় ১৭০০ বছর আগে, ৩০১ খ্রিস্টাব্দে এই বিশাল স্তূপের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। সে সময় উচ্চতার দিক থেকে এটি ছিল মিশরের গিজার পিরামিডের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম স্থাপনা।
প্রায় সাড়ে নয় কোটি পোড়া মাটির ইট দিয়ে তৈরি এই স্থাপনাটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইটের কাঠামো হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এতে ব্যবহৃত ইটের পরিমাণ দিয়ে নিউইয়র্ক থেকে পিটসবার্গ পর্যন্ত দীর্ঘ একটি প্রাচীর নির্মাণ করা সম্ভব হতো।
আজকের প্রকৌশল প্রযুক্তি আধুনিক যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হলেও, প্রাচীন যুগে এমন কোনো প্রযুক্তি ছাড়াই নির্মিত এই স্থাপনা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে—যা এখনো গবেষকদের বিস্মিত করে।
বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের বাইরে প্রথম যে স্থানে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই পবিত্র ভূমি অনুরাধাপুরা। পূর্ণিমার দিনে এখানে গেলে দেখা যায় সাদা পোশাক পরিহিত হাজারো পুণ্যার্থী এবং গেরুয়া বসনের ভিক্ষুদের সমাগম।
দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে পূজা ও ধর্মীয় আচার প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। জেতবনরামায়া ছিল একটি বিশাল মঠ কমপ্লেক্সের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে একসময় শত শত ভিক্ষুর বসবাস ছিল। পুরো মঠ এলাকা এমনভাবে পরিকল্পিত ছিল, যাতে ভিক্ষুরা ঘর থেকে বের হলেই প্রথমে স্তূপটি দেখতে পান—যা তাদের আধ্যাত্মিক মনোযোগ ও শৃঙ্খলার কথা স্মরণ করিয়ে দিত।
তবে এই স্থাপনার ইতিহাস সবসময় শান্ত ছিল না। নির্মাণের সময় স্থানীয় রক্ষণশীল বৌদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের ফলে এটি দীর্ঘ সময় অবহেলার শিকার হয়।
সময়ের প্রবাহে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময় পুরো স্থাপনাটি জঙ্গলে ঢেকে যায়। একসময় প্রায় ৪০০ ফুট উচ্চতার এই স্তূপ এখন সংস্কার শেষে প্রায় ২৩৩ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে। মাটির ইটের হওয়ায় এটি পাথরের পিরামিডের তুলনায় প্রকৃতির কাছে বেশি নাজুক ছিল। তবুও এর টিকে থাকা প্রমাণ করে তৎকালীন স্থপতিদের অসাধারণ দক্ষতা।
শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, লক্ষ লক্ষ ইট সংগ্রহ, পরিবহন এবং নিখুঁতভাবে স্থাপন করা ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা আজও বিস্ময় জাগায়।
মন্তব্য করুন