দেশের প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নকল ও নিম্নমানের কনডমের বিস্তার জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক অধিকার—দুটোর জন্যই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ তৈরি করছে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কক্সবাজারের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে এসব পণ্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, স্বনামধন্য কোম্পানির কনডমের তুলনায় অনেক কম দামে স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী নিয়মিত বিভিন্ন নামের কনডম সরবরাহ করছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এসব পণ্যের চাহিদা বেশি হওয়ায় বাজারে নকল ও মানহীন কনডমের বিস্তার বাড়ছে।
নিরাপদ যৌনতা, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং যৌনবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষা মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন কনডমে প্রায়ই ‘মাইক্রোলিকেজ’ বা অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে, যা ব্যবহারকারীর অজান্তেই কনডমের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের পাশাপাশি যৌন সংক্রমিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া, জেনিটাল হার্পিস, জেনিটাল ওয়ার্টস (এইচপিভি), হেপাটাইটিস বি ও সি—এসব যৌন সংক্রমিত রোগের বিস্তার বাড়ছে। অনিরাপদ যৌন আচরণ এর একটি কারণ হলেও নিম্নমানের সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবহারও ঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশে কনডমসহ যেকোনো ওষুধের অনুমোদন দেয় সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৬টি কোম্পানির ৫৭টি ব্র্যান্ডের কনডম সরকারি অনুমোদন নিয়ে বাজারে রয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো কনডম অনুমোদিত নয়। অনুমোদিত কনডমগুলোর মধ্যে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) আটটি ব্র্যান্ড সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সরকারি তথ্য বলছে, দেশে বাজারে প্রায় ১৯০টি ব্র্যান্ডের কনডম পাওয়া যাচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত ১৪০টি অনুমোদনহীন। অর্থাৎ এসব পণ্যের মান পরীক্ষা হয়নি এবং সরকারি অনুমোদনও নেই।
ডিজিডিএর কর্মকর্তারা জানান, কোনো কনডম বাজারজাতের আগে পরীক্ষাগারে মান যাচাই এবং উৎস দেশের ‘ফ্রি সেল সার্টিফিকেট’ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এসব ধাপ সম্পন্ন না হলে অনুমোদন দেওয়া হয় না।
পর্যটন এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অননুমোদিত কনডমের ব্যবহার বেশি হওয়াও উদ্বেগের বিষয়। পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সৈকতসংলগ্ন এক দোকানি জানান, পর্যটন মৌসুমে কনডমের বিক্রি বেড়ে যায় এবং কম দামের ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি থাকে। বেশি লাভের আশায় দোকানিরাও এসব পণ্য বিক্রি করতে আগ্রহী হন।
কক্সবাজারের এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, কম দামের এসব কনডম সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারেও পাচার হচ্ছে। পর্যটন এলাকায় পণ্যের মান যাচাইয়ে অনেক ক্রেতা গুরুত্ব দেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলেই পণ্যের মান ভালো—এমন ধারণা অনেক বিক্রেতার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাকে বিপজ্জনক বলে মনে করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সমরেশ চন্দ্র হাজরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে যৌন সংক্রমিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে সিফিলিসের ক্ষেত্রে। সামাজিক পরিবর্তন, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন এবং সুরক্ষাসামগ্রীর মানহীনতা—সব মিলিয়েই এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গত বছর রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন কনডম জব্দ করা হলেও সীমিত জনবল ও সক্ষমতার কারণে নিয়মিত নজরদারি কঠিন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ব্যবসায়ীদের তথ্যে জানা যায়, কিছু অসাধু চক্র বিদেশ থেকে পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ ল্যাটেক্স ও রাবার এনে নতুন মোড়কে বাজারজাত করছে। এসব কনডমে প্রয়োজনীয় লুব্রিকেন্ট কম থাকে এবং রাবারের মানও নিম্নমানের হওয়ায় মাইক্রোলিকেজের ঝুঁকি বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়েই ভাইরাস ও শুক্রাণু প্রবেশ করতে পারে। ফলে এইচআইভিসহ অন্যান্য যৌন সংক্রমিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কনডমের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
দেশে যৌন সংক্রমিত রোগের ঊর্ধ্বগতি ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮১৯ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হন, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। এছাড়া অন্যান্য যৌন সংক্রমিত রোগের হারও বাড়ছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় খুলনা বিভাগের দুই হাজারের বেশি মানুষের ওপর সমীক্ষায় গনোরিয়া ও ক্ল্যামাইডিয়ার সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য উঠে আসে। গবেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর কৌশল এখন জরুরি।
মন্তব্য করুন