ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ পুরোপুরি না কাটতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন আলোচনা। সামনে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান, আর তাই আবারও সামনে এসেছে ‘ইফতার রাজনীতি’।
প্রতি বছর রমজানে রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইফতার মাহফিলের আয়োজন করলেও নির্বাচনি বছরের রমজানে এসব আয়োজন পায় বাড়তি গুরুত্ব। সদ্য নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীরা বিজয়ের পর প্রথম রমজানে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বার্তা দিতে ইফতারকে বেছে নিচ্ছেন। অনেকে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ধারাবাহিক ইফতার আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যাতে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।
অন্যদিকে যারা সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি বা জয়ী হতে পারেননি, তারাও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে রমজানকে কাজে লাগাতে চান। বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে ছোট ছোট ইফতার আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সদ্য বিজয়ী এমপি-মন্ত্রীদের সংবর্ধনার আড়ালে আস্থা অর্জনের চেষ্টায় মাঠে নামছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর নেতা-কর্মীরাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইফতার কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সম্পর্ক পুনর্গঠন ও শক্তি প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ পার হতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সচিবালয়ে দায়িত্ব গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন স্থগিত থাকায় জনপ্রতিনিধিত্বে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে দ্রুত নির্বাচনের বিকল্প নেই। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। এ মন্ত্রণালয় বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়–এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
মন্ত্রীর বক্তব্যের পরই দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নতুন করে মাঠ গোছাতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থীরা মসজিদভিত্তিক ইফতার, এতিমখানায় খাবার বিতরণ এবং দরিদ্র মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কর্মসূচি নিচ্ছেন। এতে একদিকে সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় ভোটারদের কাছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অনেক এলাকায় একই দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর ইফতার আয়োজন ঘিরে নীরব প্রতিযোগিতাও দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এবারের রমজানে রাজনৈতিক অঙ্গন থাকবে সরব। ইফতার মাহফিল হয়ে উঠবে কৌশল নির্ধারণ, সম্পর্ক দৃঢ়করণ এবং শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার আগেই রমজানের এই ‘ইফতার রাজনীতি’ স্থানীয় নির্বাচনের মাঠকে অনেকটাই উত্তপ্ত করে তুলবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
মন্তব্য করুন