কেরানীগঞ্জে হাজারো গ্রাহকের শতকোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রতারণার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে শুভাঢ্যা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনের মেয়ে এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যামিউজমেন্ট ক্লাব’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজনিন আক্তার উষা নাজিমের নাম। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুত প্লট, লভ্যাংশ কিংবা বিনিয়োগের অর্থ ফেরত না দিয়ে উল্টো হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাদের।
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, সাবেক চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন জীবিত অবস্থায় একাধিক আবাসন প্রকল্প পরিচালনা করতেন। এর মধ্যে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের পাশাপাশি হাসনাবাদ হাউজিং, কেরানীগঞ্জের চান্দেরচর বিসিআরএসপি প্রকল্প, বেয়ারা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পে গ্রাহক আকৃষ্ট করতে ২০১১ সালে কক্সবাজারে প্রায় ৭০০ বিঘা জমির ওপর ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যামিউজমেন্ট ক্লাব’ নামে একটি বিনোদন পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। সদস্যপদ দিয়ে মালিকানার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার সদস্যের মধ্যে দুই হাজার আজীবন সদস্যের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার সাধারণ সদস্যের কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এভাবে কেবল ক্লাবের সদস্যপদ থেকেই কয়েক কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে প্লট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয় গ্রাহকদের কাছ থেকে।
অভিযোগ রয়েছে, চান্দেরচর বিসিআরএসপি প্রকল্পে প্লট দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৪০০ জনের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। এছাড়া হাসনাবাদ সুপার মার্কেট, টিকাটুলির হাটখোলা বিসমিল্লাহ গার্ডেন, বরিশাল ও গাজীপুরে আবাসন প্রকল্পসহ অর্ধশতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাজিম উদ্দিনের নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিপুল সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে ডুপ্লেক্স বাড়ি, ইকুরিয়ায় বহুতল ভবন, রাজধানীর শ্যামলীতে জমি, বসুন্ধরা ও বারিধারায় ফ্ল্যাট ও প্লট উল্লেখযোগ্য।
২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নাজিম উদ্দিনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তিনি জীবদ্দশায় গ্রাহকদের নামে জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন না করায় তার মৃত্যুর পর সম্পত্তির মালিকানা চলে যায় তার পরিবারের সদস্যদের হাতে। এরপর তার মেয়ে নাজনিন আক্তার উষা ক্লাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন। অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকেই ক্লাবের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে এবং গোপনে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্লাব সদস্যদের প্রতি বছর বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া, লভ্যাংশ প্রদান কিংবা সদস্যপদ বাতিল করলে বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছুই দেওয়া হয়নি। বরং টাকা ফেরত চাইলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা চলতি বছরের ২ জানুয়ারি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় নাজিম উদ্দিনের দুই ছেলে, একাধিক মেয়ে এবং তার তিন স্ত্রীকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা।
ভুক্তভোগীদের একজন জানান, তারা বিনিয়োগের টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে অনেকেই নিরাপত্তার ভয়ে তাদের পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
অন্যদিকে, ক্লাব সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, নাজিম উদ্দিন জীবদ্দশায় প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন। তবে তার মৃত্যুর পর পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো বিনিয়োগকারী।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাজনিন আক্তার উষা। তার দাবি, তাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ক্লাবের কার্যক্রম পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে এবং আজীবন সদস্যদের জন্য ভবিষ্যতে কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও বিনিয়োগের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
সবমিলিয়ে, কেরানীগঞ্জের এই ঘটনাটি এখন বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির রূপ নিয়েছে। হাজারো গ্রাহকের বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, আর প্রতিকার পেতে তারা এখন আইনি লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করছেন।
মন্তব্য করুন