মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি না পড়লেও তার প্রতিধ্বনি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং ইরানে হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার খবর দেশজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো ঘাটতি নেই; বরং মানুষের আতঙ্ক, গুজব এবং অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতাই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র, মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং জ্বালানি মজুত বিশ্লেষণে জানা গেছে, দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আমদানিও স্বাভাবিকভাবে চলছে। তেলের ডিপো থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত সরবরাহ চেইন কার্যকর রয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সম্ভাব্য সংকটের গুজব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে, যা কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন, যা আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন বাড়বে। অকটেন মজুত রয়েছে ১০ হাজার ৫০০ টন এবং শিগগিরই আরও ৭১ হাজার ৫৪৩ টন যুক্ত হবে। পেট্রোলের মজুত রয়েছে ১৬ হাজার টন, যার সঙ্গে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আরও ৩৬ হাজার টন যোগ হওয়ার কথা রয়েছে। এই হিসাবই প্রমাণ করে, সরবরাহ ঘাটতির বাস্তব কোনো সংকট নেই।
তবুও রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন সাধারণ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আগের তুলনায় বেশি সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ক্রেতার চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আগের তুলনায় দেড়গুণ পর্যন্ত বেশি জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও মানুষের ভিড় কমেনি। বরং আতঙ্কের কারণে অনেকে বারবার তেল সংগ্রহ করছেন, কেউ কেউ আবার প্রয়োজনের বাইরে মজুত করছেন।
ঢাকার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও বাসের দীর্ঘ সারি কয়েকশ মিটার ছাড়িয়ে কখনও এক কিলোমিটারের বেশি পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে সংকট হতে পারে এই আশঙ্কায় তারা আগেভাগেই তেল সংগ্রহ করছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ তেল সংগ্রহ করে পরে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করছেন।
ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে। এমনকি অনেক গ্রাহক দিনে একাধিকবার তেল নিতে আসছেন। আগে যেসব গাড়ি গ্যাসে চলত, সেগুলোও এখন তেল নিচ্ছে—যা চাহিদা বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ।
অন্যদিকে, তিনটি প্রধান তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান—পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম এবং যমুনা অয়েল—নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মেট্রিক টন ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকে ডিপোগুলোও প্রতিদিন খোলা রেখে সরবরাহ জোরদার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ইতোমধ্যে একাধিক জ্বালানিবাহী জাহাজ ভিড়েছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ পথে রয়েছে। চলতি মাসেই প্রায় ১৭টি জাহাজে জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু জাহাজের ক্ষেত্রে বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তবুও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এছাড়া ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনাও রয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে ক্রুড অয়েল আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়।
তবে কিছু এলাকায় আংশিক সমস্যাও দেখা গেছে, বিশেষ করে অকটেন সরবরাহে সাময়িক ঘাটতির কারণে কিছু পাম্পে বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে বাইক ও প্রাইভেটকার চালকদের ভোগান্তি বেড়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সাময়িক এবং সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো সংকট নেই। বরং মানুষের মধ্যে গুজবনির্ভর আতঙ্ক এবং অতিরিক্ত চাহিদাই বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য প্রচার অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে বাস্তব সংকটের আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে অযাচিত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মন্তব্য করুন