অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে বড় অঙ্কের একটি বাস ক্রয় প্রকল্প ঘিরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের বিদায়ের প্রাক্কালে প্রায় ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩৪০টি বাস কেনার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিষয়টি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—সরকার পরিবর্তনের প্রাক্কালে এত বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত এবং এতে জনস্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না।
ডিসেম্বর মাসে বাস সংগ্রহ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দরপত্র নিষ্পত্তির কথা থাকলেও পরে জমা দেওয়ার সময় আরও বাড়ানো হয়। সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী এগুলো কারিগরি ও আর্থিক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নিয়ম মেনেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো ধরনের তড়িঘড়ি করা হচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, এত বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ঠিক আগে নেওয়া হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে তারা মনে করেন।
এই প্রকল্পের আওতায় ৩৪০টি সিএনজিচালিত একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার অর্থায়নের বড় অংশ আসছে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের ঋণ থেকে। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০ বছরের বাস সরবরাহ অভিজ্ঞতা, বিপুল সংখ্যক বাস রপ্তানির রেকর্ড এবং নির্দিষ্ট উৎপাদন সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কঠোর শর্ত পূরণ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান বিশ্বে সীমিত, ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পের মূল প্রস্তাবে বাসগুলো কোরিয়ায় নির্মিত হওয়ার শর্ত থাকলেও পরবর্তীতে তা শিথিল করা হয়েছে—এখন কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান হলেই চলবে। শর্ত পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ বড় অঙ্কের ঋণনির্ভর প্রকল্পে শর্ত পরিবর্তন জনস্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিআরটিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও সময় লাগবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের মেয়াদে হবে না। তবে অতীতের বিভিন্ন প্রকল্পে কারিগরি মূল্যায়ন নিয়ে অভিযোগ থাকার কারণে এই প্রকল্পেও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
এই প্রকল্প ২০২৩ সালে অনুমোদন পেলেও দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক জট, পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব এবং ঋণদাতা সংস্থার পর্যবেক্ষণের কারণে অগ্রগতি থমকে ছিল। প্রায় আড়াই বছর স্থবির থাকার পর হঠাৎ করে দ্রুত অগ্রগতি হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি নজর কাড়ছে।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর গণপরিবহন আধুনিকায়ন অবশ্যই জরুরি; তবে বাস কেনার পাশাপাশি সেগুলোর সংরক্ষণ, রুট ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল নাও দিতে পারে।
সুশাসন ও মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনসম্পদের ব্যবহার, ঋণ গ্রহণ এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নির্বাচনের প্রাক্কালে নেওয়া প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত যেন জনগণের আস্থা ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডকে শক্তিশালী করে—সেই প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।
মন্তব্য করুন