দেশের কৃষি খাতকে ঘিরে নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায়, বিশেষ করে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রে এখনো তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। এই খাতটি তো আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতির একটি মূল স্তম্ভ, তবু ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণের অংশ এখানে খুবই সীমিত।
একদিকে ঋণের কিস্তি আদায় করতে ব্যাংকগুলো যেন অত্যন্ত কঠোর হয়ে ওঠে, অন্যদিকে নতুন ঋণ বিতরণে তাদের মধ্যে এক ধরনের অনীহা দেখা যায়। এই দুই ধরনের চাপের মাঝখানে পড়ে কৃষকেরা বিপাকে পড়ছেন। অনেকের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে যতটা তৎপরতা দেখায়, নতুন করে অর্থায়ন করতে ততটাই ধীরগতির। ফলে যখন প্রয়োজনীয় ঋণ সময়মতো না পাওয়া যায়, তখন কৃষকদের উৎপাদনের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না, এবং সামগ্রিক কৃষিকাজই ব্যাহত হয়ে পড়ে।
মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করেন, তাদের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। ঋণ পাওয়ার জন্য এখনো অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়, কাগজপত্রের একটা বিশাল চাপ সামলাতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো দালালদের ওপর নির্ভর করার অভিযোগও উঠছে। এসবের ফলে কৃষকদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে, ব্যাংকের প্রতি তাদের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন কৃষি খাত আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি, তখন এখানে ঋণের প্রবাহ এত সীমিত থাকলে তা শুধু আর্থিক বৈষম্যের সৃষ্টি করবে না, ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও একটা বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, কৃষকেরা যদি সঠিক সময়ে অর্থায়ন না পান, তাহলে উৎপাদন কমবে, বাজারে খাদ্যের দাম বাড়বে, এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর মাস শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকায়। অথচ সব খাত মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মোট ঋণের মাত্র ২ দশমিক ১৬ শতাংশই কৃষি খাতে গেছে। এটা তো সত্যিই চিন্তার বিষয়, কারণ দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ শ্রমশক্তি এই খাতে নিয়োজিত। জিডিপিতে কৃষির অবদানও ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবু ব্যাংকগুলোর নির্ধারিত ঋণ লক্ষ্যমাত্রায় কৃষির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষির গুরুত্বের তুলনায় এই হার অত্যন্ত কম। এটা বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মেলে না, বরং এতে কৃষকদের প্রতি এক ধরনের নীতিগত অবহেলা প্রকাশ পায়। যদি কৃষি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো দরকার, যাতে কৃষকেরা আরও সহজে অর্থায়ন পান এবং উৎপাদন বাড়াতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষি খাতে ব্যাংকগুলো মোট ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৯ দশমিক ৬৯। এই বৃদ্ধি স্বাগতযোগ্য হলেও, একই সময়ে ঋণ আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। সে হিসাবে আগের অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে আদায় হয়েছিল প্রায় ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে আদায় বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। এই সংখ্যাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঋণ বিতরণ কিছুটা বাড়লেও আদায়ের ওপরও সমান জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনেক কৃষকের অভিযোগ হলো, নতুন ঋণ পাওয়ার জন্য যতটা জটিলতা এবং সময় লাগে, কিস্তি আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ততটাই কঠোর এবং দ্রুত হয়ে ওঠে। এতে কৃষকেরা মানসিক চাপে পড়েন এবং অনেক সময় ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, কৃষকদের ঋণখেলাপির হার অন্য খাতের তুলনায় অনেক কম হলেও, ব্যাংকগুলো নানা অজুহাত দেখিয়ে কৃষি ঋণ দিতে অনিচ্ছুক। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অতীতে বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং সেই ক্ষতি পূরণ করে পুনরুদ্ধার করতে আরও বেশি ঋণের দরকার ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে ঋণের প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দিকে ঝুঁকছেন, যেমন স্থানীয় মহাজন বা অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছেন, যা প্রায়শই উচ্চ সুদের হারে হয় এবং তাদের আরও বিপাকে ফেলে। এতে কৃষি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমান ঋণের লক্ষ্যমাত্রা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কৃষি এবং কৃষকদের উন্নয়নের জন্য ঋণ বিতরণকে আরও সহজ করতে তারা নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। যেমন, ব্যাংক শাখার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং, সাব-ব্রাঞ্চ, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং এরিয়া অ্যাপ্রোচ পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আশা করা যায় যে, কৃষকেরা আরও সহজে ঋণ পাবেন এবং খাতটি আরও শক্তিশালী হবে। তবে, এই উদ্যোগগুলো যাতে মাঠপর্যায়ে সফল হয়, সেজন্য আরও নজরদারি এবং সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সামগ্রিকভাবে, কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো না হলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে, এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠবে। তাই, নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন