ডিজিটাল ডেস্ক
২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:০৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
Shopno Bunon Real Estate (Reborn)

‘চমক’ নাকি ‘ডিজাস্টার’?

‘চমক’ নাকি ‘ডিজাস্টার’?

হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ঝানু অর্থনীতিবিদ ও দলনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত ড. আহসান এইচ মনসুরকে অব্যাহতি দিয়ে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এ সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গন, ব্যাংকিং খাত ও নীতিনির্ধারণী মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। নিয়োগের দিনটি কার্যত ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’-তে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা প্রভৃতি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনায় অংশ নিতে হয় গভর্নরকে। বৈদেশিক ঋণ, নীতি-সহায়তা, সংস্কার কর্মসূচি ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে জটিল দরকষাকষিতে নেতৃত্ব দিতে হয় তাকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ আমলা বা গবেষণাভিত্তিক আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে গভর্নর নিয়োগের প্রচলন ছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় সারির গার্মেন্টস উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে বসানোয় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা নতুন গভর্নর সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। অনেকেই সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গেলেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় প্রশ্ন তুলেছেন—৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, তা অর্জনে প্রয়োজন বার্ষিক প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। বর্তমানে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও দক্ষ অর্থনীতিবিদ বা ঝানু ব্যাংকারকে দায়িত্ব দিলে কি বেশি যৌক্তিক হতো না?

কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়ে বলে নতুন সরকারের নেতারা অভিযোগ করেছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে এক ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। এ অবস্থায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থমন্ত্রী নীতিগত দিকনির্দেশনা দিলেও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব গভর্নরের ওপরই বর্তায়। অনেক ক্ষেত্রেই মুদ্রানীতি, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক তদারকি ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় গভর্নরের ভূমিকা অর্থমন্ত্রীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে গভর্নরকে দেশের অর্থনীতির এক ধরনের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবেও দেখা হয়।

নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও। তার জীবনবৃত্তান্তে করপোরেট অর্থায়ন, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনে অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে ব্যাংকিং বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং বিষয়ে সরাসরি কাজের রেকর্ড না থাকায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—এই পদে তার নিয়োগের নেপথ্যে অন্য কোনো সমীকরণ আছে কি না।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আসবে।

অর্থনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন, নতুন গভর্নর সম্পর্কে তার তেমন জানা নেই, তাই মন্তব্য করতে চান না। তিনি ইঙ্গিত দেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, নতুন সরকার তাদের আস্থাভাজন কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে পারে—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদ, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দক্ষতা নতুন গভর্নরের রয়েছে কি না—সেটি সময়ই প্রমাণ করবে।

সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

নতুন গভর্নরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ পুনর্গঠন, ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি দমন, খেলাপি ঋণ কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি—সবকিছুতেই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, পুঁজিবাজার উন্নয়ন, শিল্প ও সেবা খাত সম্প্রসারণ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংস্কারসহ ১৫টি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে প্রতিবছর ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত ও ছয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। নতুন গভর্নরকে এই অস্থিরতা সামাল দিতে হবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া ও পটভূমি

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর ১০(৫) ধারা অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে চার বছরের জন্য গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, শর্ত হচ্ছে তিনি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করবেন।

ড. আহসান এইচ মনসুরকে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেয়। ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণসহ নানা ইস্যুতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অবশেষে তার অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিচিতি

১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া মোস্তাকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে আইসিএমএবি থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি নেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে করপোরেট ফিন্যান্স, রফতানি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছেন।

তিনি বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংক-বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন। অতীতে পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পরিষদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। রিহ্যাব, ডিসিসিআই ও আটাবের সদস্য হিসেবেও বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন।

সময়ই বলবে

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ বা আমলার বাইরে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর করা হলো। এটি সরকারের কৌশলগত ‘চমক’, নাকি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত—তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠাই হবে নতুন গভর্নরের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৫৪ জেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রবাসীদের সুখবর দিল আরব আমিরাত সরকার

সিম কিনে মামলার আসামি, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতারণার শিকার বহু পরিবার

ইরানের হামলায় ঘাঁটি ছেড়ে আত্মগোপনে হাজারো মার্কিন সেনা

যুদ্ধ বন্ধে তিন শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

আখাউড়া দেবগ্রামে রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক খুঁটি: দুর্ভোগ চরমে!

রাষ্ট্রপতির সংসদে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার নেই : তাহের

প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস আজ

মধ্যরাতে লাইভে এসে ২০ দিনের কাজের হিসাব দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

১০

৫ আগস্টের পর ভাগ্য খুলেছে জামায়াত নেতার ছেলের

১১

প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনা আমাদের দায়িত্ব

১২

তখন থেকে ঢালিউডে ‘নোংরামি’ শুরু! বিস্ফোরক দাবি অপু বিশ্বাসের

১৩

আকিজ বশির গ্রুপে চাকরি, দ্রুত অনলাইনে আবেদন করুন

১৪

জ্বালানি সংকট : আজ থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

১৫

এবার ২৬ মার্চে আলোকসজ্জা করা হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬

তারেক রহমানকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিমানে ছিল গুরুতর ত্রুটি, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

১৭

হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের ধারায় ফিরেছে বাংলাদেশ : রাষ্ট্রপতি

১৮

পুলিশে ‘সার্জেন্ট’ পদে বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন যেভাবে

১৯

ঈদে টানা ৭ দিনের ছুটি

২০