দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ব্যাংকিং আপডেট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ঋণ শ্রেণিতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি নাজুক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশে। অথচ ২০২৪ সালের একই সময়ে এ হার ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বড় ঋণে খেলাপির হার প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, যা ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছোট থেকে বড়—সব শ্রেণির ঋণেই খেলাপির হার বেড়েছে। তবে ঋণের পরিমাণ যত বেশি, খেলাপির ঝুঁকিও তত বেশি হয়েছে।
এই তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, বড় করপোরেট ঋণগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি জমা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ২০২৩–২৪ অর্থবছর থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় সব ঋণসীমায় শ্রেণিকরণ অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে—
এ থেকে বোঝা যায়, ঋণের মানসংক্রান্ত সমস্যা কেবল বড় ঋণে সীমাবদ্ধ নয়; ছোট ঋণেও ঝুঁকি বাড়ছে।
খেলাপি ঋণ কোন খাতে বেশি—সেটিও প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতেই সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় করপোরেট ঋণে ঝুঁকি বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ধাক্কাও বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
গত বছরের জুন শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছিল ৩৪ দশমিক ৬০ শতাংশে। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্যাংকারদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সামনে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রকাশ পেত না। এখন প্রকৃত হিসাব তুলে ধরা হচ্ছে বলে পরিসংখ্যানে বড় উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, এই প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী সময়ে খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়তে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এরপর দীর্ঘ সময়ে ঋণের পরিমাণ ও ঝুঁকি—দুইই দ্রুত বেড়েছে।
সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের ঋণে দ্রুত বাড়তে থাকা খেলাপি প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঋণ মূল্যায়ন, নজরদারি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
মন্তব্য করুন