দেশের অন্যতম মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং পরবর্তীতে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি ‘নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস’-এ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার আগ্রহের কথা তুলে ধরেন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি চান।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো চিঠিতে ব্যারিস্টার আরমান প্রথমেই বৈঠকের সুযোগ দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বৈঠকটি তার অনুরোধেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং আলোচনার মূল বিষয় ছিল ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ও লাইসেন্স সংক্রান্ত সহায়তা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা নিশ্চিত করাই তার লক্ষ্য।
চিঠিতে তিনি আরও জানান, তার সঙ্গে ইতোমধ্যে কয়েকজন সম্ভাব্য বিদেশী বিনিয়োগকারী যুক্ত হয়েছেন, যারা বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবাখাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। নগদের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। এ ধরনের অডিট হলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক, পরিচালনাগত ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি, সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে বলে তার দাবি।
নগদের যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ। শুরুতে এটি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সেবা হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাস্তবে কোম্পানিটির মালিকানা ছিল থার্ড ওয়েভ টেকনোলজি লিমিটেডের হাতে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা বিতর্ক সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স ছাড়াই এবং প্রচলিত নীতিমালা উপেক্ষা করে নগদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রথমে দায়িত্ব পান বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার; পরে তার স্থলাভিষিক্ত হন মো. মোতাছিম বিল্লাহ। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।
পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর বিশেষ নিরীক্ষায় নগদে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে আর্থিক জালিয়াতি, অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি এবং হিসাববহির্ভূত লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়। নিরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব গরমিলের তথ্য উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ঘটনায় উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নগদের মালিকানা হস্তান্তর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে হবে এবং সর্বোচ্চ দরদাতা মালিকানা পাবে—এটাই প্রচলিত রীতি। ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে মালিকানা হস্তান্তরের সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নগদের শতভাগ শেয়ার এখনো ‘নগদ লিমিটেড’-এর নামে। আর ওই কোম্পানির মালিকানায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক কিছু নেতা ও ব্যবসায়ী, যাদের কেউ কেউ বর্তমানে পলাতক। ফলে মালিকানা হস্তান্তরের আগে আইনি প্রক্রিয়ায় শেয়ার বাজেয়াপ্ত বা সরকারের অনুকূলে হস্তান্তর প্রয়োজন হতে পারে। সরকারের পূর্ণ মালিকানা নিশ্চিত না হলে তৃতীয় পক্ষের কাছে মালিকানা হস্তান্তরের প্রশ্নই আসে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নগদের মতো একটি বড় এমএফএস প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এ প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার আরমানের নির্বাচনী হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি টাকা হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তিনি নিজে নাকি কেবল সমন্বয়কের ভূমিকায়?
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, তিনি দেশী-বিদেশী বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থার স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। তার দাবি, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ছাড়া দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পতিত সরকারের সময়কার অব্যবস্থাপনায় নগদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; সঠিক বিনিয়োগকারী পেলে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, আইনি কাঠামো এবং নীতিগত স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যারিস্টার আরমানের বিনিয়োগ উদ্যোগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে নগদের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। বাজারে শক্ত অবস্থান থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত বাজারমূল্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির মাধ্যমে নগদের সম্পদের মান নির্ধারণে ফরেনসিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে। ২০১৬ সালে তিনি গুমের শিকার হন এবং দীর্ঘ আট বছর বন্দিদশায় ছিলেন বলে দাবি করেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে গভর্নরকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও ব্যারিস্টার আরমানের বক্তব্য, তার উদ্দেশ্য কেবল বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং দেশের আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা।
নগদের মতো একটি বিতর্কিত কিন্তু উচ্চ সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে মালিকানা কাঠামো, আইনি প্রক্রিয়া, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও চলমান মামলার বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ছাড়া এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন হলে ভবিষ্যতে নতুন করে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বিষয়টি। এর মধ্যেই ব্যারিস্টার আরমানের আগ্রহ দেশের আর্থিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য করুন